যাকাতুল ফিত্‌র

যাকাতুল ফিত্‌র / ছদকাতূল ফিতর

মহান আল্লাহ  রব্বুল আলামীন মুসলিম জাতির জন্য আনন্দ ও খুশির দিন হিসাবে  ২ টি দিন নির্ধারণ করেছেন একটি হচ্ছে  ঈদুল ফিত্‌র ও অপরটি ঈদুল আযহা । ঈদুল ফিত্‌র খুশির দিনে ধনীদের সাথে গরীবরাও যেন সমানভাবে আনন্দ ও খুশিতে অংশগ্রহণ করতে পারে সেজন্য মুসলমানদের উপর যাকাতুল ফিত্‌র ফরয করা হয়েছে। মহানবী (সঃ) বলেছেন,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ فَرَضَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِيْنِ مَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلاَةِ فَهِىَ زَكَاةٌ مَقْبُوْلَةٌ وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلاَةِ فَهِىَ صَدَقَةٌ مِنَ الصَّدَقَاتِ-

অর্থঃ আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যাকাতুল ফিত্‌র ফরয করেছেন ছিয়াম পালনকারীর অসারতা ও যৌনাচারের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করার জন্য এবং মিসকীনদের খাদ্য স্বরূপ। যে ব্যক্তি তা ছালাতের পূর্বে (ঈদের ছালাত) আদায় করবে তা যাকাত হিসাবে গ্রহণীয় হবে। আর যে ব্যক্তি ছালাতের পরে আদায় করবে তা (সাধারণ) ছদকার মধ্যে গণ্য হবে’। [ আবুদাউদ হা/১৬০৯; ইবনু মাজাহ হা/১৮২৭; আলবানী, সনদ হাসান। ]

 যাকাতুল ফিতর যাদের উপর ফরযঃ
 এই নিয়ে ২টি অভিমত পাওয়া যায়।

প্রথমতঃ
অধিকাংশ আলেমদের মতে কারও নিকট ঈদের দিনে তার পরিবারের জন্য একদিন-একরাত ভরণ-পোষণের জন্য খাবারের অতিরিক্ত যাকাতুল ফিতর আদায় করার মত অর্থাৎ এক সা’ পরিমাণ খাদ্য থাকলেই তাকে ফিতরা আদায় করতে হবে। ফিতরা প্রদানকারী ব্যক্তি তার নিজের, তার স্ত্রী, তার উপর নির্ভরশীল সকলের পক্ষে, এমনকি তার উপর নির্ভরশীল পিতা-মাতার উপরও ফিতরা আদায় করতে হবে।যাকাতুল ফিতর ফরয প্রত্যেক নারী-পুরুষ, স্বাধীন-গোলাম, ছোট-বড়, মুসাফির-মুকিম, ধনী-দরিদ্র মুসলিমের উপর। যাকাতুল ফিত্‌র ফরয হওয়ার জন্য নিছাব পরিমাণ (সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ ভরি রোপ্য অথবা এর সমপরিমাণ অর্থ)  সম্পদের মালিক হওয়া শর্ত নয়। কেননা যাকাতুল ফিতর ব্যক্তির উপর ফরয; মালের উপর ফরয নয়। মালের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। মালের কম-বেশীর কারণে এর পরিমাণ কম-বেশী হবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যাকাতুল ফিত্‌র হিসাবে মুসলমানদের ছোট-বড়, পুরুষ-নারী এবং স্বাধীন-ক্রীতদাস প্রত্যেকের উপর এক ছা‘ খেজুর অথবা এক ছা‘ জব ফরয করেছেন।
[বুখারী হা/১৫০৩, ‘যাকাত’ অধ্যায়, ‘ছাদাকাতুল ফিতর’ অনুচ্ছেদ; মুসলিম হা/৩৮৪; মিশকাত হা/১৮১৫।]

অত্র হাদীছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছোট ও ক্রীতদাসের উপর যাকাতুল ফিত্‌র ফরয বলে উল্লেখ করেছেন। যাকাতুল ফিত্‌র ফরয হওয়ার জন্য নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া শর্ত হলে, ছোট ও ক্রীতদাসের উপর যাকাত  ফিত্‌র ফরয হত না। কেননা সবেমাত্র জন্ম গ্রহণ করা সন্তানও ছোটদের অন্তর্ভুক্ত, যার নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। অনুরূপভাবে দাস সাধারণত নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় না। এজন্যই রাসূলুল্লাহ (সঃ) দাসের উপর যাকাতুল ফিত্‌র ব্যতীত তার সম্পদের যাকাত ফরয করেননি। যেমন হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ لَيْسَ فِيْ الْعَبْدِ صَدَقَةٌ إِلاَّ صَدَقَةُ الْفِطْرِ-

অর্থঃ আবু হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ‘ছাদাক্বাতুল ফিত্‌র ব্যতীত ক্রীতদাসের উপর কোন ছাদাক্বাহ্ (যাকাত) নেই’।[মুসলিম হা/৯৮২; মিশকাত হা/১৭৯৫।]

এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সঃ) ধনী-গরীব সকলের উপর যাকাতুল ফিৎর ফরয বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,

أَدُّوْا عَنْ كُلِّ إِنْسَانٍ صَاعًا مِنْ بُرٍّ عَنِ الصَّغِيْرِ وَالْكَبِيْرِ وَالذَّكَرِ وَالأُنْثَى وَالْغَنِىِّ وَالْفَقِيْرِ فَأَمَّا الْغَنِىُّ فَيُزَكِّيْهِ اللهُ وَأَمَّا الْفَقِيْرُ فَيَرُدُّ اللهُ عَلَيْهِ أَكْثَرَ مِمَّا أَعْطَى-

অর্থঃ ‘মানুষের মধ্যে প্রত্যেক ছোট-বড়, পুরুষ-নারী, ধনী-গরীবের নিকট থেকে এক ছা‘ গম (যাকাতুল ফিৎর) আদায় কর। আর ধনী, যাকে আল্লাহ এর বিনিময়ে পবিত্র করবেন। আর ফকীর, যাকে আল্লাহ এর বিনিময়ে তার প্রদানকৃত যাকাতুল ফিৎরের অধিক ফিরিয়ে দিবেন’।[দারাকুতনী হা/২১২৭]

দ্বিতীয়তঃ
ইমাম আবুহানিফা র:  মত হলো, ঈদের দিন সকালবেলা যার কাছে প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও সে দিনের খাবার ব্যতীত নেসাব পরিমাণ সম্পদ  (সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ ভরি রোপ্য অথবা এর সমপরিমাণ অর্থ) থাকবে, তার ওপরই যাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে।এ ক্ষেত্রে পূর্ণ বৎসর সম্পদের মালিকানা থাকার বিষয়টি প্রযোজ্য নয় যাকাতের ক্ষেত্রে ঘরের আসবাবপত্র হিসাবে আনা হয় না। কিন্তু ফিতরার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় আসবাবপত্র ব্যতিত অন্যান্য দ্রব্যাদি, অতিরিক্ত ঘর (খালি বা ভাড়ায় ব্যবহৃত) ইত্যাদি সম্পদ বিবেচিত হবে।

যাকাতুল ফিত্‌র কিভাবে আদায় করবেনঃ
প্রত্যেক দেশের প্রধান খাদ্য হিসেবে যা বিবেচিত, তা দিয়েই যাকাতুল ফিতর আদায় করা উত্তম, আবুসাঈদ খুদরি রা:-এর হাদিসে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বাংলাদেশে যেহেতু চাল প্রধান খাদ্য, এক ছা’ চাল দিয়ে এটা আদায় করা অধিক উত্তম।নগদ অর্থ দিয়ে যাকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে কি না, এ নিয়েও মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদ র: ও সৌদি আরবের খ্যাতনামা আলেমগণের মতে, নগদ অর্থ দেয়া বৈধ হবে না। হাদিসে নগদ অর্থের কথা উল্লেখ নেই। আতা, হাসান বাসরি, ছুফয়ান সাওরি, ওমর বিন আব্দুল আজীজ, ইমাম আবু হানিফা ও তার অনুসারীদের মতে, নগদ অর্থ দিয়ে আদায় করা বৈধ। কেননা যাকাতুল ফিতর আদায়ের অন্যতম লক্ষ্য হলো দরিদ্র মানুষগুলোকে ঈদের আনন্দের সুযোগ করে দেয়া। তাদের প্রয়োজন খাদ্যের, তেমনি প্রয়োজন কাপড়চোপড় ও অন্যান্য সামগ্রীর। আমাদের দেশে টাকা দিয়ে যাকাতুল ফিতর আদায় করা হয়ে থাকে তবে সেটা উত্তম নয় কারণ রাসূলুল্লাহ  (সঃ) এর যুগে মুদ্রা হিসেবে দিরহাম প্রচলিত ছিলো। দিরহামের দ্বারা কেনা কাটা, দান খয়রাত করা হতো তবুও আল্লাহর রাসূল (সঃ) খাদ্যদ্রব্য দ্বারা যাকাতুল ফিত্‌র আদায় করতেন।  আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, ‘আমরা এক ছা‘ ত্বা‘আম বা খাদ্য, অথবা এক ছা যব, অথবা এক ছা খেজুর, অথবা এক ছা পনির, অথবা এক ছা কিশমিশ থেকে যাকাতুল ফিৎর বের করতাম।[বুখারী হা/১৫০৬; মুসলিম হা/৯৮৫; মিশকাত হা/১৮১৬] 

ইবনু ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যাকাতুল ফিত্‌র হিসাবে মুসলমানদের ছোট-বড়, পুরুষ-নারী এবং স্বাধীন-দাস প্রত্যেকের উপর এক ছা‘ খেজুর অথবা এক ছা‘ যব ফরয করেছেন এবং তিনি ছালাতের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বেই তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।[ বুখারী হা/১৫০৩, ‘যাকাত’ অধ্যায়, ‘ছাদাকাতুল ফিৎর’ অনুচ্ছেদ; মুসলিম হা/৩৮৪; মিশকাত হা/১৮১৫ ] তাই আমাদের উচিত খাদ্য দ্রব্য দ্বরা যাকাতুল ফিত্‌র আদায় করা। আর যারা টাকার মাধ্যমে যাকাতুল ফিত্‌র আদায় করবেন নিম্নে এ বছর ২০১৯  এ

ইসলামিক ফাউন্ডেশন নিম্ন বর্ণিত হারে যাকাতুল ফিত্‌র নির্ধারণ করেছে।

খাদ্যের নাম পরিমাণ মূল্য
গম বা আটা ১কেজি ৬৫০ গ্রাম ৭০টাকা
খেজুর ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম ১৬৫০ টাকা
যব ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম ২৭০ টাকা
কিসমিস ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম ১৫০০ টাকা
পনির ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম ২২০০টাকা

 

যাকাতুল ফিতর / সদ্‌কাতুল ফিতর কখন আদায় করবেন

যাকাতুল ফিতর আদায়ের দুটি সময় রয়েছে:

১. ফযীলতপূর্ণ সময়।

২. জায়েয সময়।

    ফযীলতপূর্ণ সময়: ঈদের দিন সকালে ঈদের সালাতের পূর্বে। কারণ;

রসূলল্লাহ বলেছেন-

«كُنَّا نُخْرِجُ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ»

অর্থঃ ‘আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় যাকাতুল ফিতর ঈদুল ফিতরের দিনে এক সা‘ পরিমাণ খাদ্য আদায় করতাম।’ [বুখারী: ১৫১০]

অনুরূপভাবে বুখারীতে ইবন ‘উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,

«أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِزَكَاةِ الْفِطْرِ، أَنْ تُؤَدَّى قَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلَاةِ»

অর্থঃ ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে ঈদের সালাত পড়তে যাওয়ার পূর্বে যাকাতুল ফিতর আদায় করার আদেশ দিয়েছেন।’[বুখারী: ১৫০৩; মুসলিম: ৯৮৬।]

জায়েয সময়: ঈদের একদিন দু’দিন পূর্বে যাকাতুল ফিতর আদায় করা।

সহীহ বুখারীতে নাফে‘ বর্ণনা করেন, ইবনে ‘উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নিজের এবং ছেট-বড় সন্তানদের পক্ষ হতেও যাকাতুল ফিতর প্রদান করতেন। এমনকি তিনি আমার সন্তানদের যাকাতুল ফিতরও প্রদান করতেন। তিনি যারা যাকাতুল ফিতর গ্রহণ করত তাদেরকেই প্রদান করতেন। আর তারা ঈদের একদিন বা দু’দিন পূর্বে যাকাতুল ফিতর দিতেন। [বুখারী: ১৫১১]

«مَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلَاةِ، فَهِيَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ، وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلَاةِ، فَهِيَ صَدَقَةٌ مِنَ الصَّدَقَاتِ»

অর্থঃ ‘ঈদের সালাতের পূর্বে আদায় করলে তা যাকাতুল ফিতর হিসাবে গণ্য হবে। আর ঈদের সালাতের পর আদায় করলে তা অন্যান্য সাধারণ দানের মত একটি দান হবে।’[আবু দাউদ: ১৬০৯; ইবন মাজাহ: ১৮২৭; মুস্তাদরাকে হাকেম ১/৪০৯।]

বিঃদ্রঃ উপরে উল্লেখিত হাদীসগুলো থেকে বোঝা যায় ঈদের সালাত পড়তে যাওয়ার পূর্বে যাকাতুল ফিতর আদায় করা যায়,চাইলে এক দুই দিন আগেও প্রদান করা যেতে পারে তবে একান্ত কারণ ছাড়া ঈদের ছলাতের পরে যাকাতুল ফিত্‌র আদায় করা ঠিক হবে না।আদায় হবে কিন্তু তা সাধারণ দান হিসেবে গন্য হবে যা আমরা উপরে উল্লেখিত হাদিস থেকে জানতে পারলাম।